যেখানে চিন্তা বন্দি, সেখানেই ফানোঁর বিপ্লব শুরু
![]() |
| ফ্রাঞ্জ ফানোঁ। ছবি গ্রাফিক্স |
রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ও উপনিবেশায়ন- এই দুটি প্রক্রিয়া এক সঙ্গে সংঘটিত হলেও, প্রকৃত অর্থে উপনিবেশায়ন একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রকল্প। সামরিক ও প্রশাসনিক দখলের পর, শুরু হয় ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় ও চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।
উপনিবেশিত সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ধ্বংস করে সেখানে ঔপনিবেশিক শক্তির চিন্তাধারা প্রতিস্থাপন করাই এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। এই সাংস্কৃতিক পরাধীনতা এতটাই গভীর হয় যে, উপনিবেশ রাজনৈতিকভাবে বিদায় নেওয়ার পরও মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা রয়ে যায়।
স্বাধীনতার পরও উপনিবেশিত দেশের অভিজাত শ্রেণি- যারা উপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সুবিধাভোগী- প্রাক্তন উপনিবেশকারীর ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।
ফলে তৈরি হয় এক ধরণের ‘অদৃশ্য উপনিবেশ’ যা মনোজগতে কাজ করতে থাকে।
ফানোঁর দৃষ্টিতে
ফরাসি-আলজেরীয় মনোবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফ্রাঞ্জ ফানোঁ ছিলেন ঔপনিবেশিক নিপীড়ন ও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তার লেখায় তিনি তুলে ধরেছেন কীভাবে বর্ণবাদ, ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে উপনিবেশিক শাসন একটি কাঠামো তৈরি করে, যার মূল ভিত্তি হল জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস।
‘অ্যা ডাইং কলোনিয়ালিজম’ বইতে তিনি আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব হয়েছে।
বর্ণবাদ
ফানোঁর মতে, উপনিবেশিক শাসন মানেই সহিংসতা। এই সহিংসতা শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি উপনিবেশিতদের পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করার একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক সহিংসতা। শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকদের আধিপত্য উপনিবেশিতদের মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করে, ফলে তারা শ্বেতাঙ্গদেরকেই শ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
এই সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই ফানোঁ বৈপ্লবিক সহিংসতার কথা বলেন।
বিউপনিবেশায়ন: আত্মমুক্তির প্রক্রিয়া
ফানোঁর দৃষ্টিতে বিউপনিবেশায়ন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ও মানসিক মুক্তি। এটি একটি জাতির স্বতন্ত্র পরিচয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া, যেখানে উপনিবেশিতরা তাদের নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করে।
বিউপনিবেশায়ন সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে জাতিকে তিনটি ধাপ পাড়ি দিতে হয়- আত্তীকরণ, জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির অন্বেষণ, জাতীয়তাবাদী বিপ্লব ও জনগণের সঙ্গে মিশে যাওয়া।
এই তৃতীয় ধাপেই ঘটে ‘রেভলিউশনারি ভায়োলেন্স’, যা উপনিবেশিত ব্যক্তিকে মানসিক মুক্তি দেয়।
সহিংসতা: মুক্তির হাতিয়ার না মানসিক বিপর্যয়?
ফানোঁর মতে, সহিংসতা উপনিবেশিত মানুষের জন্য একপ্রকার ‘পরিশোধন প্রক্রিয়া’। শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার মাধ্যমে উপনিবেশিত মানুষ বুঝতে পারে যে শ্বেতাঙ্গ প্রভুরাও মৃত্যুভয় ও দুর্বলতায় ভোগে। এতে ভেঙে পড়ে শ্রেষ্ঠত্বের মিথ, এবং মানুষ নিজেকে পূর্ণরূপে স্বাধীন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
তবে ফানোঁ এটাও স্বীকার করেছেন যে, সহিংসতা মানেই মুক্তি নয়। এটি যদি রাজনৈতিক শিক্ষা ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে তা মানুষের মানসিক বিকৃতি ঘটাতেও পারে।
বিপ্লবের চার শ্রেণি- কে এগিয়ে?
ফানোঁ উপনিবেশিক সমাজে চারটি শ্রেণিকে চিহ্নিত করেছেন যারা ভিন্ন ভিন্নভাবে বিউপনিবেশায়নে ভূমিকা রাখতে পারে—
১. ফানোঁর মতে, উপনিবেশিত দেশগুলোর বুর্জোয়ারা ইউরোপীয় বুর্জোয়ার মতো শিল্প, প্রযুক্তি বা সংস্কৃতির উদ্ভাবক নন। বরং তারা কেবল ভোগে মত্ত, নৈতিকতাবিহীন এবং ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুগামী। তারা নিজেরাই উপনিবেশিক শক্তির উত্তরসূরি হয়ে ওঠে।
২. শহুরে প্রলেতারিয়েত (শ্রমিক শ্রেণি)
মার্ক্সের মতে, এই শ্রেণি বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হলেও, ফানোঁর বিশ্লেষণে আফ্রিকান প্রেক্ষাপটে তাদের ভূমিকায় দেখা যায় সীমাবদ্ধতা। এরা অনেক সময় উপনিবেশিক শক্তির সহযোগী শ্রেণি হিসেবে কাজ করে। তবে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকায় সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এরা বিপ্লবী হতে পারে।
৩. কৃষক শ্রেণি
ফানোঁর দৃষ্টিতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিপ্লবী শক্তি হলো গ্রামীণ কৃষকরা। তারা উপনিবেশিক শিক্ষার প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত, তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা কম, এবং তারা জাতীয়তাবাদী চেতনায় সমৃদ্ধ। মাও মাও বিদ্রোহ ও অন্যান্য কৃষক আন্দোলন এর উদাহরণ।
৪. শহুরে বেকার ও প্রান্তিক মানুষ
যদিও মার্ক্স এই শ্রেণিকে বিপ্লববিরোধী ও বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন, ফানোঁ তাদের মধ্যে অদম্য বিদ্রোহী মনোভাব দেখেছেন। এই শ্রেণির মানুষদের মধ্যে হারানোর কিছু নেই, তাই তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা গেলে তারা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী শক্তি।
জুবায়ের দুখু
শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ।



Comments
Post a Comment