লিঙ্গ বৈষম্য রোধে বৈশ্বিক সূচকে এগিয়ে বাংলাদেশ, তলানিতে পাকিস্তান
![]() |
| গ্রাফিক্স কার্ড। |
এবারের সূচকে পাকিস্তান ১৪৮টি দেশের মধ্যে একেবারে নিচের দিকের স্থানে রয়েছে, যা দেশটির জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বার্তা।
২০০৬ সালে সূচক চালু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান প্রায় প্রতি বছরই নিম্নমুখী অবস্থানে থেকেছে। ২০২৩ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১৪২তম; দুই বছর পর সেই অবস্থান আরও খারাপ হয়ে গেছে। এটি শুধু পাকিস্তানের লিঙ্গ বৈষম্যের গভীরতা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটেরও প্রতিফলন।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আবারও আশার আলো জ্বালিয়েছে। ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশ ২৪তম স্থানে উঠে এসেছে, যা শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা প্রশংসনীয়। প্রতিবেশী ভারত এই সূচকে ১৩১তম স্থানে থাকলেও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক এগিয়ে। আফগানিস্তানের মতো দেশগুলো তথ্যের অভাবে সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়নি; ফলে পাকিস্তানই কার্যত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবে উঠে এসেছে।
লিঙ্গ বৈষম্যের বহুমাত্রিকতা
পাকিস্তানে নারীর অভিজ্ঞতা সমান নয়— অঞ্চল, সামাজিক শ্রেণি এবং গ্রামীণ-শহুরে বিভাজন অনুযায়ী এর রূপ ভিন্ন। শহরাঞ্চলের শিক্ষিত নারী কিছুটা এগোলেও গ্রামীণ পাকিস্তানে নারীরা প্রায় সম্পূর্ণরূপে আর্থ-সামাজিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পশ্চাদপদ অঞ্চলে নারীর চলাফেরায় কড়াকড়ি, বাল্যবিবাহের উচ্চ হার এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার অভাব এখনো প্রবল।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাক্ষরতার হার কিছুটা বেড়েছে, তবুও ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ পড়তে-লিখতে পারেন। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ নারী এখনো নিরক্ষর। শিক্ষার এই ঘাটতি শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, সমাজ ও অর্থনীতির সামগ্রিক অগ্রগতির পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, অপুষ্টি এবং চিকিৎসার অভাব নারীর মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাল্যবিবাহ, যা নারীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
দেশটিতে আরেকটি গভীর সংকট হলো সহিংসতা। ২০২০ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পাকিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ঘরোয়া সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, অনার কিলিং এবং ধর্ষণের মতো ঘটনা সমাজে নারীর নিরাপত্তাবোধ ও মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
শ্রম ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বারবার উঠে আসে— নারীর অদৃশ্য শ্রম। গৃহস্থালি কাজ, শিশু ও বয়স্কদের যত্ন, কিংবা কৃষিকাজে নারীর অবদান আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয় না। পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিক শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২৩ শতাংশ। অথচ কৃষি, বুনন শিল্প, গৃহস্থালি শ্রম- সব ক্ষেত্রেই তাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু পুরুষের তুলনায় তারা ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কম আয় পান।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, যদি পাকিস্তানের নারীরা পুরুষের সমান সুযোগ ও পারিশ্রমিক পেতেন, তাহলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ত। কিন্তু সামাজিক ট্যাবু, নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে নারীর কর্মসংস্থান ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম আয় করেন। ঘন্টাপ্রতি মজুরির হিসাব করলে নারী কর্মী পান প্রায় ৭৫০ টাকা, যেখানে পুরুষ পান ১,০০০ টাকা। মাসিক হিসাবে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যদিও ২০১৮ সালে এই মজুরি বৈষম্য ছিল ৩৩ শতাংশ, সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা কমেছে, তবুও পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারী কর্মীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হন। মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কাজে ফিরে আসলে তাদের নমনীয় কর্মঘণ্টার প্রয়োজন হয়, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা কম বেতন মেনে নিতে বাধ্য হন।
শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগ এই বৈষম্যের প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক খাত বা সরকারি চাকরিতে কিছুটা সমতা থাকলেও অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাতে পরিস্থিতি ভয়াবহ। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে বৈষম্যের হার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
আইএলও প্রতিনিধি গেইর টি. টনস্টল মনে করেন, ‘শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে নারীর প্রতি মজুরি বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে।’ এরই মধ্যে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে শ্রম কোড সংস্কার করা হয়েছে, তবে বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ পাকিস্তানে কিছুটা বেড়েছে, তবে তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় ২০ শতাংশের মতো স্থির রয়েছে দীর্ঘ এক দশক ধরে। ২০১৩ সালে এটি ছিল ২০.৭৪ শতাংশ, ২০১৮ সালে কমে দাঁড়ায় ২০.২৩ শতাংশ, আর ২০২১ সালে হয় ২০.১৮ শতাংশ।
দেশটিতে সংরক্ষিত আসন নারীদের সংসদে প্রবেশাধিকার দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কার্যকর নেতৃত্ব এবং মন্ত্রীপর্যায়ে নারীর ভূমিকা প্রায় অনুপস্থিত।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব প্রায় ২০.২ শতাংশ। সংবিধান অনুযায়ী ৬০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও, এই আসনের অধিকাংশ নারী বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়নেই আসেন। ফলে তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত। সবচেয়ে হতাশাজনক হলো, বর্তমানে মন্ত্রীসভায় নারীর সংখ্যা কার্যত শূন্য, যার অর্থ উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণে নারী কণ্ঠ অনুপস্থিত।
জুবায়ের দুখ, কবি ও শিক্ষার্থী।



Comments
Post a Comment