অভিজিৎ রায় হত্যা: ফারাবী ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন

 

গ্রাফিক্স কার্ড। 


২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার টিএসসি এলাকায় নৃশংসভাবে খুন হন মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও গুরুতর আহত হন। এই বর্বরোচিত হামলা শুধু ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং ছিল মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা ও বিজ্ঞানমনস্কতা বিরোধী মৌলবাদী আক্রমণের জঘন্য নিদর্শন। অভিজিৎ রায়ের মৃত্যু বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার ধারাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিন্দার ঝড় তোলে।

এই ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার শেষে ২০২১ সালে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। রায়ে উল্লেখ করা হয়, ফারাবী সরাসরি হত্যায় অংশগ্রহণ না করলেও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে হত্যাকারীদের প্রভাবিত ও সহায়তা করেছিলেন। সেই প্রেক্ষিতে তাকে ‘পরোক্ষ সহযোগী’ হিসেবে দণ্ডিত করা হয়।

তবে ২০২২ সালে ফারাবীর করা আপিল হাইকোর্ট গ্রহণ করলে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হয় এবং শেষপর্যন্ত চলতি বছরের ২২ আগস্ট হাইকোর্ট তার অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করে।

জামিনের শর্তে বলা হয়, মামলার মূল আপিল এখনো বিচারাধীন এবং এর ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত ফারাবীকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হবে। আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, মামলার সাক্ষীদের মধ্যে কেউই ফারাবীর নাম উল্লেখ করেননি, এবং তিনি কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেননি। এইসব যুক্তিকে ভিত্তি করেই আদালত জামিন মঞ্জুর করেছেন।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে- কীভাবে একজন ব্যক্তি, যিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেননি, কেবল অনলাইনে উসকানিমূলক বক্তব্যের জন্য যাবজ্জীবন সাজা পেতে পারেন? আবার একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও উঠে- তার এসব উসকানি কি বাস্তবে হত্যার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করেনি? এটি বিচারব্যবস্থার একটি জটিল ও সূক্ষ্ম এলাকা, যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সন্ত্রাসে পরোক্ষ ভূমিকার দায় নির্ধারণের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ফারাবী জামিন পাওয়ায় আইনের দৃষ্টিতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলা চলে, তবে একই সঙ্গে অভিজিৎ রায়ের মতো একজন মুক্তমনা লেখকের হত্যার ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ায় এটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফারাবীর মুক্তি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেমন আনন্দিত অনেকে, তেমনি অন্য এক পক্ষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভও প্রকাশ পেয়েছে। অভিজিৎ রায়ের সমর্থকেরা মনে করেন, ফারাবীর জামিন তাদের মনে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারহীনতার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।

আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে, একজন আসামি যখন দীর্ঘ সময় ধরে বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে থাকেন এবং যদি মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যে তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ না থাকে, তাহলে আদালতের জামিন মঞ্জুর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে ফারাবীর বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না থাকা, সাক্ষীদের তার নাম না বলা এবং তার দীর্ঘ আট বছরের কারাভোগ- সবমিলিয়ে জামিনযোগ্যতা তৈরি করেছে।

তবে একই সময়ে, জামিন মানেই মুক্তি নয়, কিংবা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়। জামিন কেবল একটি সাময়িক আইনি অবস্থা, যা কোনো আসামিকে বিচারাধীন থাকাকালীন জামিনে মুক্ত থাকার সুযোগ দেয়। মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী বা নির্দোষ বলে ঘোষণা করা যায় না।

এখানে রাষ্ট্রের দায়ও অনস্বীকার্য। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের মতো একটি উচ্চপ্রোফাইল মামলার বিচার প্রক্রিয়া দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকাটা বিচার বিভাগের গতিশীলতা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একদিকে একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে একমাত্র বিজ্ঞানমনস্ক লেখক হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এক বাঙালির মৃত্যু- এই দুটি উপাদানই বিচার ব্যবস্থাকে আরও ত্বরান্বিত করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু বাস্তবে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এই ধরনের মামলাকে বিভ্রান্তিকর করে তোলে এবং জনমনে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বিষয়ে আস্থার ঘাটতি তৈরি করে।

ফারাবীর মুক্তি হয়তো তার ব্যক্তিগত আইনি বিজয়, কিন্তু বৃহৎ পরিসরে এটি ন্যায়বিচার এবং মুক্তচিন্তার পক্ষে এক কঠিন বার্তা বহন করে। যারা অনলাইনে ঘৃণা ছড়ায়, ধর্মীয় অনুভূতিকে হাতিয়ার বানিয়ে মুক্তবুদ্ধিকে আক্রমণ করে, তাদের দায় কতটুকু- তা আবার নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে।

Comments