 |
| গ্রাফিক্স কার্ড। |
ড. রেফাত আলারি ছিলেন একজন ফিলিস্তিনি লেখক, কবি, অনুবাদক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং অধিকৃত গাজা উপত্যকার মানবাধিকারকর্মী। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান গণহত্যা ও অবরোধের সময় এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। ওই হামলায় ড. রেফাতের সঙ্গে তার ভাই, বোন এবং তাদের শিশুসন্তানরাও প্রাণ হারায়।
তার মৃত্যুর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে তিনি ‘যদি আমাকে মরতেই হয়’ শিরোনামের এই নামে একটি কবিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন এবং সেটিকে নিজের টুইটার প্রোফাইলের পিন করেছিলেন। কবিতাটিতে তিনি নিজের সম্ভাব্য মৃত্যুর কথাকে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ভঙ্গিতে তুলে ধরেন।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশ্বজুড়ে শোকাহত হয়ে পড়ে। তার এই কবিতাটি নানা ভাষায় অনুবাদ করে ড. রেফাতকে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার লেখা, তার ভাবনা, এবং তার প্রতিরোধের কণ্ঠ।
তিনি শুধু একজন কবি নয়, ড. রেফাত আলারি হয়ে উঠেছেন সেইসব কণ্ঠের প্রতিনিধি, যারা দখল, নিপীড়ন ও নীরবতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন।
ইংরেজি থেকে বাংলায় করেছে জুবায়ের দুখু
আমি তুমি
আমি হই তুমি।
এক, দুই—
পদক্ষেপ গুনি।
আয়নায় তাকাও,
দেখো ভয়, ভয়!
তোমার এম-১৬-র আঘাতে
ব্যথা লাগে—
দেখো সারামুখে হলুদ ছাপ,
গুলির দাগের মতো ছড়িয়ে
যেমন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে
মৌমাছির কামড় শরীরময়।
তখন হৃদয়ের যন্ত্রণা গড়িয়ে পড়ে
চোখ বেয়ে,
নাসারন্ধ্র দিয়ে,
কানে কানে—
প্লাবিত করে চারপাশ।
যেমন করেছিল
আমাদের পূর্ব পুরুষদের সঙ্গে
সত্তর বছর আগে।
আমি কেবলই তুমি,
আমি তোমার অতীত,
তাই তাড়া করি
তোমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ।
আমি লড়ি, যেমন লড়েছিলে তুমি
আমি প্রতিরোধ করি, যেমন করেছিলে তুমি।
এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলাম,
তোমার দৃঢ়তাকে নেব আদর্শ করে—
যদি না তোমার হাতে থাকা বন্দুকের নল,
থাকতো আমার রক্তাক্ত চোখে।
এক, দুই—
পদক্ষেপ গুনি।
ঠিক সেই একই বন্দুক
ঠিক সেই একই গুলি
যাতে মরেছিল আমাদের মা-বাবা,
আজ তা চলছে আমার বুকে—
বন্ধু কে ওই গুলিকর?
চিহ্নিত করো ওই গুলিটা,
চিহ্নিত করো ওই বন্দুকটা,
শুঁকলেই বুঝবে—
এতে আমার রক্ত
এতে পিতার রক্ত,
এতে মায়ের রক্ত—
ওই বন্দুক, ওই গুলিই জানে
কোন অতীত, কোন বর্তমান, কোন ভবিষ্যৎ,
অতিকায় নেতিয়ে পড়েছে
যুদ্ধবিমানের গানে।
আমরা যমজ—
অস্ত্র ও যুদ্ধ যেমন
এই জীবনরেখায়
ভাত ও বন্দুকের সুর তেমন।
এই যন্ত্রণা,
কোন খুনির মুখভঙ্গিতে আঁকবে?
ওরা সব একই—
শুধু পার্থক্য এই যে,
আমরা শিকার
ওরা সবাই শিকারী।
আমি বলছি—
আমিই তুমি,
কিন্তু আমি এখন আমি একা নই
যেমন তুমি এখন তুমি একা নও।
আমি ওদের ঘৃণা করি না,
আমি চাই—
আর কোনো ফুল
আর কোনো পাতা
আর কোনো গাছ
না মরে ওদের হাতেই বেড়ে উঠুক।
ওরা যেন থামে
থামাও বন্ধু
আর রক্তপাত
আর যুদ্ধবিমানের গান
যেন না বাজে—
ওদের গুলির তেজস্ক্রিয়ায়
পুড়ছে দেখো
আমার বুক—
অথচ আমরা জলপাইফুল।
ওরা কি থামবে
এক মুহূর্তের জন্য
থামবে কি?
থামাও বন্ধু, থামাও, থামাও!
যে দৃশ্য দেখি
বধিরের মতো—
হৃদয়কে চুপ রেখে,
চোখ খোলা তবু অন্ধের মতো
আর মনের আয়না চুরমার করে।
এক, দুই
পদক্ষেপ গুনি
আমিই তুমি—
আমি তোমার অতীত।
আমাকে হত্যা করলে
তুমি নিজেকেই হত্যা করো।
যদি আমাকে মরতেই হয়
যদি আমাকে মরতেই হয়,
তবে তোমাকে বাঁচতে হবে—
আমার গল্প আর চিত্রগুলো বিক্রি করে
এক টুকরো কাপড় কিনে
আর কিছু সাদা সুতো কিনে,
একটা ঘুড়ি বানাবে।
যে ঘুড়ির লম্বা লেজ
শাদা আকাশে নাচবে,
গাজার আকাশে—
শিশু এক তাকিয়ে থাকবে
তার চোখ দেখলে বুঝবে যেন ও স্বর্গের দিকে তাকিয়ে—
ওর চোখে আশার আলো,
যেন তার বাবার অপেক্ষায়—
যে পিতা আগুনে পুড়ে
চলে গেছে দূরে, বহু জলপাইগাছ মারিয়ে।
যে ঘুড়িটি বানাবে
যখন উড়াবে আকাশে,
তখন ওই শিশুটি ভাববে এক মুহূর্তের জন্য—
ভাববে হয়তো এসেছে দেবদূত,
ভালোবাসা বুকে নিয়ে ঘুরছে দিগন্তে।
যদি আমাকে মরতেই হয়,
তবে এ মৃত্যু যেন আশার আলো হয়ে ফোটে,
এ মৃত্যু যেন হয়ে ওঠে
একটি গল্প, একটি কবিতা।
আমরা এখনো বেঁচে আছি
আরও একটি দিন গাজায়
আরও একটি দিন ফিলিস্তিনে
আরও একটি দিন কারাগারে
আমরা এভাবে বেঁচে থাকি
ইসরায়েলের রাইফেলের গানে।
আমরা যে রাইফেলকে
আমাদের পরিবারের চেয়ে বেশি দেখি,
আর আইডিএফের মীমাংসায়
আমরা মাথা নুইয়ে দেই প্রতিনিয়ত তাদেরই বাহুতে।
যখন ঘুমিয়ে থাকি—
অম্ল বৃষ্টির মতো
আমাদের জীবন ঝরে পড়ে,
যেনবা আমরা একটি পাতা—
বৃদ্ধরা যখন ইবাদত করে
আমরা উচ্চস্বরে যখন বলি ‘আমিন’
তখনও আমাদের নিঃশ্বাসের কাছে
ইসরায়েলের জানকবজ-পাখি
যারা কেবলই নিয়েছে হয়তো প্রাণ—
আর উড়ছে
আমাদের স্বপ্ন, আমাদের প্রার্থনা রোধ করতে।
তবুও আমাদের ঈশ্বরের দিকেই যাওয়া
আমরা স্বপ্ন দেখি, আমরা প্রার্থনা করি,
জীবনকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরি
প্রতিবার যখন,
কোনো প্রিয়জন মরে যায়
অথবা ইসরায়েল দেয় মৃত্যুদণ্ড—
আমরা বাঁচি।
আমরা বাঁচি।
আমরা সত্যিই বাঁচি।
Comments
Post a Comment