সমাজে অপরাধ বাড়ে কখন?

 

গ্রাফিকস কার্ড। 


সমাজে অপরাধ কখন এবং কেন বৃদ্ধি পায়- এই প্রশ্নটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক চিন্তার একটি কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে বড় নগরকেন্দ্রগুলোতে, অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যই নয়, সাধারণ নাগরিক, নীতিনির্ধারক এবং সমাজবিজ্ঞানীদের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং এটি অর্থনীতি, সমাজ, পরিবার, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় নীতির পারস্পরিক ক্রিয়ার ফল। এই প্রবন্ধে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো বিশদভাবে আলোচনা করা হবে এবং নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে।

আর্থ-সামাজিক কারণ

অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো আর্থ-সামাজিক সংকট। দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং শিক্ষার অভাব দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। যখন সমাজের একটি বড় অংশ মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন তাদের সামনে বৈধ ও অবৈধ পথের পার্থক্য ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব মানুষকে হতাশ করে তোলে এবং সেই হতাশা অনেক সময় অপরাধমূলক আচরণে রূপ নেয়।

শিক্ষার অভাবও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি নৈতিকতা, আইন সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধ গঠনের ক্ষেত্রেও অপরিহার্য। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।

নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি

দ্রুত নগরায়ন এবং লাগামহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি অপরাধের আরেকটি বড় কারণ। গ্রাম থেকে শহরে মানুষের ব্যাপক স্থানান্তরের ফলে নগর এলাকায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আবাসন সংকট, বস্তি সম্প্রসারণ এবং অপরিকল্পিত নগর গঠন সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়। যেখানে মানুষ একে অপরকেঅ চেনে না, সেখানে সামাজিক নিয়ন্ত্রণও কম কার্যকর হয়।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অপরাধীদের আত্মগোপন করা সহজ হয় এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা এবং সহিংস অপরাধের হার স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।

মাদকের অপব্যবহার

মাদক ও অ্যালকোহলের অপব্যবহার সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী চালিকা কাঠামো। মাদকাসক্ত ব্যক্তি প্রায়ই আত্মসংযম হারায়, আগ্রাসী হয়ে ওঠে এবং তাৎক্ষণিক লাভের জন্য সহিংস পথ বেছে নিতে দ্বিধা করে না। অনেক সহিংস অপরাধের পেছনেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকাসক্তি জড়িত থাকে।

অন্যদিকে, অবৈধ মাদক ব্যবসা নিজেই একটি সংগঠিত অপরাধচক্রের জন্ম দেয়। মাদক পাচার, লেনদেন এবং গ্যাং-সংঘর্ষ সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং তরুণ সমাজকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।

পারিবারিক কাঠামোর ভাঙ্গন

পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক। ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোর ভাঙ্গন অপরাধ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। অস্থির, সহিংস বা ভেঙে যাওয়া পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা প্রয়োজনীয় নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও আবেগগত সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়।

পারিবারিক সহিংসতা, অবহেলা এবং তত্ত্বাবধানের অভাব শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরবর্তী জীবনে এসব শিশু অপরাধমূলক আচরণে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে, যা সামগ্রিক অপরাধের হার বাড়িয়ে তোলে।

প্রযুক্তিগত অপরাধ

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সমাজকে যেমন উন্নত করেছে, তেমনি অপরাধের নতুন ক্ষেত্রও উন্মুক্ত করেছে। সাইবার অপরাধ বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। পরিচয় চুরি, অনলাইন প্রতারণা, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং সাইবার বুলিং ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে।

এই অপরাধগুলো প্রায়ই সীমান্তের তোয়াক্কা করে না এবং প্রচলিত আইন প্রয়োগকারী কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলে অপরাধের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বৃদ্ধি পায় এবং নাগরিক নিরাপত্তা নতুনভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বিচার ব্যবস্থা অকার্যকর হলে

যে সমাজে অপরাধের শাস্তি অনিশ্চিত বা দুর্বল, সেখানে অপরাধ বাড়বেই- এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। অকার্যকর ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি করে। যদি অপরাধীরা মনে করে যে- তারা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে, তাহলে অপরাধ করার মানসিক বাধা ভেঙে যায়।

বিচার ব্যবস্থায় বিলম্ব, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব অপরাধ দমনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে।

বেশিরভাগ সহিংস অপরাধ অল্পসংখ্যক ধারাবাহিক অপরাধীর দ্বারা সংঘটিত হয়। তথাকথিত প্রগতিশীল প্রসিকিউশন নীতির ফলে অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অপরাধের বিচার এড়িয়ে যাওয়া, অপরাধকে লঘু অপরাধে নামিয়ে আনা এবং কঠোর শাস্তি আরোপে অনীহা দেখা গেছে। এর ফল হিসেবে সিরিয়াল অপরাধীরা সমাজে থেকে বারবার অপরাধ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।

এছাড়াও উদার জামিন নীতির ফলে গুরুতর অপরাধের আসামিরা বিচার-পূর্ব অবস্থায় সহজেই মুক্তি পায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই নীতির পর জামিনে মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে পুনরায় অপরাধ করার হার, বিশেষ করে সহিংস অপরাধের হার, উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

প্রশাসনের দুর্বলতা থাকলে

যেকোনো দেশেই অপরাধ দমনের প্রথম সারির প্রতিরক্ষা হলো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে। একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রশাসন সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু যখন কোনো দেশের প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা থেকে সরে এসে ক্ষমতাসীন সরকার, কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করতে শুরু করে, তখন সেই রাষ্ট্রে অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। কারণ অপরাধ দমন করার জন্য নিয়োজিত প্রশাসনই যদি তার মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে অপরাধীরা আইনকে তোয়াক্কা না করেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সাহস পায়।

প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় একটি রাষ্ট্রে অপরাধের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা সহজেই আইনের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং প্রয়োজন হলে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে বা নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিতে পারে। এতে করে অপরাধ দমন আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এছাড়াও দুর্বল বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনের সুযোগ নিয়ে মাদকচক্র ও সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীগুলো তাদের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে পারে। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মাদক স্থানান্তর, সংরক্ষণ ও সরবরাহ তখন তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়, যা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও অপরাধ প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তোলে।

ফলে প্রশাসনের এই ধরনের দুর্বলতা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।


জুবায়ের দুখু 

কবি ও সাংবাদিক 

Comments