বর্ণবাদ কি ফুটবলের সাবঅল্টার্ন?


ছবিটি এআই নিয়ে বানানো।


বর্ণবাদ—শব্দটির সঙ্গে আমরা নানা দিক থেকেই পরিচিত। এই শব্দের ভেতরে কি সত্যিই কোনো সৌন্দর্য নেই? একসময় পশ্চিমা দেশগুলোতে বর্ণবাদ ছিল একপ্রকার প্রতিষ্ঠিত প্রথা। মাঠ থেকে ঘাটে, হাট থেকে অফিসে—জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে তা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, যেন আধুনিক সময়ের সোশ্যাল মহামারী।


ফুটবল কিংবা ক্রিকেট ছোটবেলা থেকেই দেখার চেষ্টা করি—যদিও খুব একটা বুঝি না। মাঠে খেলতেও তেমন পারি না। তবু এই না-পারার মধ্যেও এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আছে; খেলতে না পারলেও আনন্দটা ঠিকই পাওয়া যায়।


চলছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপ আমার কাছে অন্যরকম অনুভূতির। আগে গ্রামে রাত জেগে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের খেলা দেখতাম। কখনো কখনো জার্মানির খেলাও দেখা হতো। সেইসব রাতে খেলা দেখা ছিল আলাদা উত্তেজনার। মাঝেমধ্যে পিকনিকের আয়োজনও করা হতো। খেলার আনন্দ যেন উৎসবে পরিণত হতো।


সেই দিনগুলো পেছনে ফেলে এখন শহরের খাঁচায় বন্দি। খোলা আকাশের নিচে নয়, বরং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসেই খেলা দেখতে হয়। তবু স্মৃতির ভেতর সেই গ্রাম, সেই রাত আর সেই উচ্ছ্বাস আজও অমলিন।


তবে আমার আলোচনা স্মৃতি নিয়ে নয়; আমার প্রশ্ন—বর্ণবাদ কি ফুটবলের সাবঅল্টার্ন?


আমি কালো বলে ছোটবেলায় গায়ের রং নিয়ে নানা কথা শুনতে হতো। কখনো ব্যাটিং বা বোলিং করতে নামলে, কখনো ফুটবল খেলতে গেলেও আমারই বন্ধুরা নানাভাবে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করত। কখনো আমাকে বলা হতো ক্রিস গেইল, আবার কখনো হতে হতো পেলে। মজার ছলে বলা এসব কথার ভেতরেও ছিল এক ধরনের অস্বস্তি- এক ধরনের অবহেলার সুর। আর এখান থেকেই আসে চাপা পড়ে যাওয়ার গল্প—যা কোনো না কোনোভাবে সাবঅল্টার্ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু কালো বলে ক্ষ্যাপানো হবে—এই ভয়েই আমি বহুদিন খেলতে যাইনি।


প্রথমে আসি সাবঅল্টার্ন ধারণায়। সাবঅল্টার্ন বলতে সাধারণত সমাজের সেই প্রান্তিক মানুষদের বোঝানো হয়, যারা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকে এবং নিজেদের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। পোস্টকলোনিয়াল স্টাডিজে এই ধারণাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। উপনিবেশ-পরবর্তী সমাজে নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অবস্থান বিশ্লেষণে এটি বহুল ব্যবহৃত একটি তাত্ত্বিক কাঠামো।


এবার দেখা যাক বর্ণবাদ বলতে কী বোঝায়। গায়ের রং, জাতি বা বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে এক শ্রেণির মানুষের ওপর অন্য শ্রেণির বৈষম্য ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতাকেই বর্ণবাদ বলা যায়।


ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পশ্চিমা সমাজে এই বর্ণবাদ দীর্ঘদিন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে নানাভাবে অবমূল্যায়ন ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে।


তাহলে প্রশ্ন আসে—আমি কালো, সাদিও মানে কালো, ভিনিসিয়ুসও কালো; তবে কি আমরা সবাই সাবঅল্টার্ন? প্রাথমিকভাবে তা-ই মনে হতে পারে। যদিও সাবঅল্টার্ন ও বর্ণবাদের সংজ্ঞা এক নয়। কিন্তু একটি জায়গায় এসে তারা পরস্পরকে স্পর্শ করে। গায়ের রঙের কারণে কর্তৃত্বশীলদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, জন্ম নেয় ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য ও আচরণ। শুধু কর্তৃপক্ষ নয়, সাধারণ দর্শকরাও গ্যালারিজুড়ে বর্ণবাদী ট্রল করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো এর বিস্তার আরও বেশি।


ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। স্পেনে ভিনিসিয়াস জুনিয়র বারবার বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছেন, যা বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ইতালিতে মারিও বালোতেল্লি এবং রোমেলু লুকাকুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি একসময় স্যামুয়েল এতো'ও দর্শকদের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠ ছাড়তে চেয়েছিলেন। এসব ঘটনা দেখায়, সমস্যা শুধু বিচ্ছিন্ন নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি কাঠামোগত।


তবে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠেছে। অনেক তারকা খেলোয়াড় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছেন। দানি আলভেস মাঠে ছুড়ে দেওয়া কলা খেয়ে একটি প্রতীকী বার্তা দিয়েছিলেন- বর্ণবাদকে ভয় না পেয়ে উপহাস করা যায়। কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং সরাসরি মাঠ ছেড়ে গিয়ে প্রতিবাদের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আর রাহিম স্টার্লিং মিডিয়ার ভেতরে থাকা বর্ণবাদী মনোভাব নিয়েও কথা বলেছেন।


আমার আলোচনায় উঠে আসা এসব মানুষ সবাই প্রতিষ্ঠিত তারকা। কিন্তু এমনও অনেক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে শুধুমাত্র গায়ের রঙের কারণে ভালো খেলেও কেউ মূল দলে জায়গা করে নিতে পারেননি কিংবা প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি। আর এখানেই আমার চোখে পড়ে সাবঅল্টার্নের প্রশ্ন। এখানেই একজন খেলোয়াড়ের গল্প চাপা পড়ে যাওয়ার গল্পে পরিণত হয়। অর্থাৎ বর্ণবাদ অনেক সময় মানুষকে সাবঅল্টার্ন অবস্থানে ঠেলে দেয়। তবে সব সাব-অল্টার্ন মানুষই যে বর্ণবাদের শিকার, তা নয়।


ধরা যাক, কেপ ভার্দের গোলরক্ষক পুরো নব্বই মিনিট অসাধারণ নৈপুণ্যের সঙ্গে খেললেন। একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে তিনি প্রায় একাই দলকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার এই পারফরম্যান্স খুব বেশি আলোচনায় আসে না। আমি বলতে চাই, অনেক সময় কোনো খেলোয়াড়কে নিজের মেধা প্রমাণের পরও স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এখানে মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া বরাবরই খেলাধুলা নিয়ে প্রচার করে এসেছে, কিন্তু তাদেরও একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। তারা সাধারণত শক্তিশালী, ধনী এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রের বিজয়ী দলগুলোর গল্প বলতে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে প্রান্তিক দল বা কম পরিচিত খেলোয়াড়দের গল্প প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। বিশেষ করে আফ্রিকার কালেঅ মানুষ বা খেলোয়াড়দের গল্প।


আমরা যেহেতু এশিয়ার একটি ছোট রাষ্ট্রের নাগরিক, আর সংবাদপত্রে কাজ করার সুবাদে আমার মনে হয়েছে—বিদেশি খেলাধুলা নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম ও বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করি। ফলে আমাদের গল্পগুলোও পুরোপুরি আমাদের হয়ে ওঠে না। এই ফাঁকেই ক্ষমতাবানদের গল্প বারবার সামনে আসে, আর প্রান্তিকদের গল্প চাপা পড়ে যায়।


পরিশেষে বলা যায়, সাবঅল্টার্ন ও বর্ণবাদ এক নয়; তবে তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্ণবাদ মানুষকে এমন এক অবস্থানে ঠেলে দেয়, যেখানে তার কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পায় না। দুটি ধারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো- কণ্ঠস্বরের অনুপস্থিতি। বর্ণবাদের কারণে যেমন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য উপেক্ষিত হয়, তেমনি সাবঅল্টার্নদের ক্ষেত্রেও প্রায়ই অন্যরা তাদের হয়ে কথা বলে। ফলে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মতামত সামনে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।


এই প্রশ্নটিই গভীরভাবে উত্থাপন করেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। তার বিখ্যাত প্রবন্ধের শিরোনাম—  ‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ ফুটবলে বর্ণবাদের আলোচনাও শেষ পর্যন্ত আমাদের সেই একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়— যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে বেশি শোনা প্রয়োজন, তাদের কথা আমরা সত্যিই শুনছি তো?


জুবায়ের দুখু 

কবি ও সাংবাদিক 

Comments